Showing posts with label বাংলা. Show all posts
Showing posts with label বাংলা. Show all posts

Sep 22, 2014

দরজী পাড়ার রকে

- অশোক রায় -



পায়ে পায়ে ঘুরি, উত্তরের সব গলি
পাড়ায় পাড়ায় রকের আড্ডা, হরেক কিসিম বুলি,
বাচ্চা,বুড়ো,যুবা - সবার আসন পাকা,
মাফ কারো নেই,সবার টিকি এইখানেতেই বাঁধা,
ওবামা বা পুতিন, হোক না ইয়েলৎসিন,
সমঝে চলেন সবাই এদের, রকের বিচার পাকা ।

উত্তরের এই বাঁকে, পুরনো সব স্মৃতির ঝাঁপি আজও খুলে ডাকে,
শঙ্খ, ঘন্টা, কাঁসর ধ্বনির মাঝে, পুরনো সব দেবালয়ে,
দেবতারা আজও ওঠেন জেগে,
দেখতে যদি চাও, দেখতে তাদের পাবে আজও,
যদি ঠিক সময়ে যাও,
সন্ধ্যাবেলায় আড্ডা মারেন সবে, দরজী পাড়ার রকে।


© Ashok Roy - Member WaaS

আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে

- তাপস কুমার দত্ত -


- তোমার কথায়
  রোদহারা শেষ বিকেলের বিষাদ মাখা,
  কষ্ট কোথায় ?

- সে সব কথা মাথার মাঝে
   জটের মত জড়িয়ে আছে

- ধীরে ধীরে পরত খোল
  ঢেউগুলো সব আছড়ে পড়ুক 
  যাবার পরে ভেসে যাবে
  কষ্ট কতক

-  ছোটবেলায় লাজুক ছিলাম

- রাগ কোর না, রূপ ছিল কি ?

- পুরুষগুলো আটকে যেত

- রূপসী তাহলে বলাই যায়

- লাজুক মেয়ে রূপসী হলে
  ঈর্ষনীয় স্বাস্থ্য পেলে
  অনেক পুরুষ
  ঝোড়ো হাওয়ায় পেতে চায়

- হাওয়ায় কখন
   জ্বললো আগুন
   টের পেলে না, তাইতো ?

- এত সরল করে যাবে না বলা
  আমার কথা 
  তোমার মত করে

 - দহন জ্বালা
  কথা হয়ে
  বাইরে আসুক
  টের পেতে চাই
  কেমন করে পেরোলে পথ,
  এখন কেমন আছো

- মা কেন যে বিরূপ ছিল
  মা-ই জানে
  বাবার কোলেই বড় হলাম
  বাড়ছি মনে মনে,
  বয়সকালে ধিকিধিকি জ্বললো আগুন
  ভুবন জোড়া ফাঁদে
  অন্যের দেখানো স্বপ্ন নিয়ে
  পরোয়া নয়, বেরিয়ে এলাম

- তার পর ?

- বাপের বাড়ি ছিল, শ্বশুরবাড়ি হল
  উচ্চাকাঙ্ক্ষী বরের নিজের বাড়ি হল
  কোনটাই কিন্তু আমার বাড়ি ছিলনা,
  এখন আমি ঘর করেছি – নিজের ঘর
  সময় কাটে নিজের ঘরেই

- মাঝের পাতা কি ফেললে ছিঁড়ে ?

- সরিয়ে রাখা পাতাগুলো আবার খুলি ,
  এবার বলি
  একজন আকাশ ছোঁয়ার আশায়
  বেপরোয়া,
  রূপসী বৌও বাজী,
  বুঝে গেলাম
  শরীরই আমার আসল ঘাতক
  তখন থেকে নিজেই আমি
  বরফ হয়ে বদলা নিলাম,
  মেয়ে -ইস্কুলে মাস্টারি নিলাম
  হারিয়ে গেলো ঘরের বুলবুলি,
  এবার তোমার কথা শুনি

- সাধারণ ছেলে ছিলাম
  সবার মতই স্বপ্ন ভরা চোখ,
  শেষকালেতে হলাম গিয়ে
  অফিস করা এলেবেলে লোক

- এই কথাতে মন ভরে না

- আসল কথা শোন,
  বর্ষা রাতে বিছানাতে
  তেমন করে আনতে পারলাম না
  পাগল করা বসন্ত

- আবার কি সেই  শরীর এলো !

- শোনই না সব,
  যেমন তেমন সাদামাঠা জীবনটুকু
  সুখেদুঃখে কাটিয়ে দিলাম সব ঋতুতেই,
  ছোট ছোট লড়াই করে
  কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো সব গাছেই গেলো ঝরে,
  ইচ্ছেগুলো ছাইচাপা দিই –
  ফাঁকি ঢাকা পড়ে

- পুরুষ বলে পারলে এটুক

- হবেও বা তাই

- এই কি তবে ভালো থাকা ?

- বোঝাবুঝির এই দোলাচলে
  এইভাবেতে লড়াই করেই
  নিজের মত বাঁচো ৷৷


© Tapas K Datta - Member WaaS

বাংলার নদ-নদী

- সর্বাণীদাস রায় -


বাংলার নদ, নদী, গ্রাম ভালোবেসে,
মন চায় ঘুরে ঘুরে দেখি এই দেশে ।
করতোয়া, চুর্নী, তোর্সা, আর জলঢাকা,
অপরূপ মাধুর্য নদী নামে মাখা ।
অজয়, দামোদর আর দ্বারকেশ নদ,
পুরুষ নামেতে তারা দুর্জয় দুর্মদ ।
কোপাই, কংসাবতী নদী আছে কত,
জলময় বঙ্গদেশে ব্যাপ্ত শত শত ।
বাসন্তী, বিদ্যাধরী, মাতলা নামে নদী ,
সুন্দর বনের পথে কভু যাও যদি ।
রায়ডাক, রঙ্গিত উত্তরবঙ্গে বহে,
মহানন্দা, কালিন্দী আছে মালদহে ।
সুবর্ণরেখা ছবি ঋত্বিকের সৃষ্টি,
পিয়ালী, শিলাবতী নাম লাগে মিষ্টি ।
টাঙ্গান, দুলুং কত ছোট ছোট নদী ,
বঙ্গদেশের ভূমে বহে নিরবধি ।
পূর্ববঙ্গে বয়ে যায় কপোতাক্ষ নদী,
মেঘনা, কীর্তিনাশা, বুড়িগঙ্গা আদি।
ধানসিঁড়ি জীবনানন্দের রচনাতে পাই,
ধলেশ্বরী, বিশখালী, ফেনী, চিকনাই ।
মায়া ভরা কত নাম দুই বাংলায়,
বর্ষা শরতে স্রোত নদী ও নালায় ।


© Sarbanidas Roy - Non-member WaaS

ব্রাহ্ম মুহূর্ত

- সুকল্যাণ বসু -


রাত্রি শেয প্রহর ।
ভোরর ফিকে আকাশ এখন আলোর পথযাত্রী ;
আনকোরা সূর্য নরম চোখ মেলে আলগোছে
আঙুল ছোঁয়াল অপেক্ষায় থাকা শিশিরের ফোটায় ;
এইমাত্র ভোঁ বাজিয়ে স্টেশন ছেড়ে গেল প্রথম আপ-ট্রেন -
চলে গেল কুয়াশার চাদর মোড়া ঘুম-কাতর শহরটাকে ছেড়ে ।

ট্রেনের আওয়াজে যাদের ঘুম ভাঙলো,
তাদের মধ্যে অনেকেই বিছানা ছাড়লেন দৈনন্দিন অভ্যাসে
সকালের প্রথম আলো গায়ে মেখে হাটতে বেরবেন কেউ
বাজারের ব্যাগটা তিনি সংগে নিলেন
ফেরার পথে বাজারটা সেরে নেওয়া যাবে
কেউ প্রাতঃকৃত্য সেরে বসে গেলেন ধ্যানে
কোলাহল-মুক্ত শান্ত বাতাবরণে ঈশ্বরকে
প্রাণে প্রাণ অনুভব করতে চাইলেন ।

কেউ কেউ লেগে গেলেন শরীরচর্চায়
আবার এমনও কেউ আছেন, রুজি যার বিষম বালাই
অনেক দূরের অফিসে হাজিরা দিতে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া চাই
আর যারা ছিঁড়ে যাওয়া ঘুমের
আমেজটাকে আরও কিছুক্ষণ বিলম্বিত করতে চাইলেন,
তারা ব্যস্ততার মুখের ওপর আলস্যের
পর্দা টেনে পাশ ফিরে শুলেন ।
অল্পদিন আগে বিবাহিত কোনও যুবক তার
নতুন গন্ধ বৌকে আঁকড়ে ঘুম-চোখে দাম্পত্যের ওম পেতে চাইলো

আর স্কুল কলেজের বড় পরীক্ষা যার দরজায় কড়া নাড়ছে,
সময়ের এই পালাবদল সে কিছুই টের পেল না ;
সারারাত পড়ে অল্প সময় আগেই
সে আশ্রয় নিয়েছে ঘুমের কোলে ।
সংবাদপত্র অফিসের সামনে এই মুহূর্তে প্রচণ্ড ব্যস্ততা
সকালের টাটকা খবর ভোর ভোর পৌঁছতে হবে পাঠকের হাতে ।
গঙ্গার ঘাটে জবা কুসুম সূর্য স্বাগত
জানিয়ে দৈনিক পাপ-স্খালনের তাগিদে
পুন্যলোভাতুর কিছু মানুষের ভিড় ।
কসাইখানায় অপ্রস্তুত  কোনও মোরগ হটাত ডেকে উঠলো

এইরকম এক ব্রাহ্ম মুহূর্তে
আমার বাবা আমাকে ছেড়ে কোথায় যে গেলেন !


© Sukalyan Basu

আশায় আশায়

- উজ্জ্বল সেনগুপ্ত -


অপারেশন থিয়েটারের নৈঃশব্দ্যটাকে
কেউ কি পারে না ছড়িয়ে দিতে
শব্দ-মুখর রাজপথে -
পারে না কি সাময়িক শান্তি দিতে
শ্রবণ-ক্লান্ত ইন্দ্রিয়টাকে ?

বসন্তের সন্ধ্যাবেলার মিষ্টি হাওয়াটাকে
কেউ কি পারে না বইয়ে দিতে
লূ-জর্জর গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে –
পারে না কি সুশীতল তৃপ্তি দিতে
এই দহন-ক্লিষ্ট দেহটাকে ??

শৈশব-কৈশোরের দিনগুলিকে
কেউ কি পারে না মিশিয়ে দিতে
দৈনন্দিন জটিল যৌবনে –
পারে না কি ক্ষণিকের মুক্তি দিতে
সমস্যা আকীর্ণ মনটাকে ?


© Ujjwal Sengupta - Member WaaS

অসমাপ্ত

- উজ্জ্বল সেনগুপ্ত -


ধীরে ধীরে চলো, হে জীবন মোর, কাউকে দেবো না ফাঁকি –
যা পেয়েছি, তার সব দিয়ে যাবো - যত ঋণ আছে বাকি ।

চলার আবেগে দুঃখ দিয়েছি যাঁদের অজানিতে –
শান্তি তো পাবো, তাঁদের বুঝিয়ে, ক্ষমাটুকু চেয়ে নিতে ।

কিছুটা ইচ্ছা বাকি রয়ে গেলো, আরও কিছু কিছু কাজ –
মনের গভীরে যে স্বপন ছিল – ভুলে যেতে হবে আজ !

যে মিতালি জোড়া লাগলো না, আর ভেঙ্গে গেছে বারে বার –
কোথায় যে রাখি এই বেদনাকে, পেয়ে তাকে হারাবার !

তুমি আগে চলো, আমি আছি পিছে, তোমা বিনা মোর কেহ নাই –
আমার যে টুকু, তোমারই জন্য, তোমাকেই তাই দিয়ে যাই !

চলো ধীরে ধীরে, হে মোর জীবন, কিছু ঋণ আজও বাকি ||


© Ujjwal Sengupta - Member WaaS

ছেলেবেলার কলকাতা

- অনিরুদ্ধ সেন -


[কম খেটে কার্যোদ্ধারের অভ্যাস আমার আবাল্যের; আজকেও তাই নিজের পুরনো লেখা থেকে টুকে দায় সারছি। আমার তিনটি ব্লগের একটিতে ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি লিপিবদ্ধ করেছি; এই লেখাটা সেখান থেকেই কিছু কাট ছাঁট করে টোকা। পাঠক নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।]


আমাদের কলকাতার আস্তানা, ২০২ রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ, আধুনিক বাংলা কবিতার ঠিকানা হিসেবে তামাম কবিতাপ্রিয় বাঙালির চেনা, অন্তত এক কালে তাই ছিল৷ ডোভ়র লেনের দিক থেকে রমণী চাটুজ্যে স্ট্রীট দিয়ে সোজা এসে রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ পেরুলে যে কালো লোহার দু পাল্লার গ্রিল গেটটায় থমকে দাঁড়াতে হয়—আজকালকার ফঙ্গবনে সেকশন ওয়েল্ড করা নয়, দস্তুরমত ঢালাই করা মাল—সেটাই ২০২, অবশ্য হকারদের নিবিড় অরণ্য ভেদ করে যদি এখন দৃষ্টি যায়! দুঃখের বিষয়, বাড়িটা এবছরই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আমার শিশুকালের গড়িয়াহাট অনেক পরিপাটি ছিল, ফুটপাথে অনেক গাছ, অ্যাভ়িনিউ নাম সার্থক: রাসবিহারী বিথী৷ ঠাকুদ্দা ঠাকুমার ঘরের জানলা দিয়ে রমণী চাটুজ্জে বরাবর নজর চলত বহু দূর—কংক্রিটারণ্যে ঠেকে যেত না৷

ট্রামের ঝঞ্ঝনায় একেকদিন কাকভোরে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলায় দাঁড়াতাম, দেখতাম বাতিওয়ালা রাস্তার আলো নেভাচ্ছে৷ কালো লোহার ফ্রেমের চার দিকে কাচ, উলটোনো পিরামিড ফ়্রাসটাম বাতি৷ মই ঠেস দেওয়ার জন্য বাতিস্তম্ভের যুতসই জায়গায় চ্যাপলিনের নেকটাইয়ের মত দুটো আধ-হাত খানেক গোলমুন্ড হাতল৷ ভিস্তিওয়ালারা মোষের চামড়ার ভিস্তি কাঁখে রাস্তা ধুচ্ছে রোজকার রোজ৷ আমাদের বাড়ির কাছে গঙ্গাজলের নলধারা ছিল সতত প্রবহমানা; দমকলের একচেটিয়া সেই হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে জীবনানন্দের কুষ্ঠরোগীর পক্ষে জল চেটে নেয়া সম্ভব ছিলনা কোনমতে, কারণ হয়ত প্রবাহরোধের কলকব্জা, ম্যানহোলের ঢাকনাগুলোর মত, চুরি হয়ে গিয়েছিল কবে, অথবা সে হয়ত বা একদিন গিয়েছিল ফেঁসে; তাই হোজ় দিয়ে জল দেবার সুযোগ ছিল না আর! আর জন্মান্তরের অপেক্ষায় অনপহৃত পড়ে ছিল প্রাগৈতিহাসিক বিশাল বিশাল দুটো ঢালাই লোহার চৌবাচ্চা, ট্রামের দীর্ঘবিলুপ্ত ঘোড়াদের জল খাবার জন্য, জানলা দিয়ে যে দৃষ্টিপথ তার কিছুটা বাইরে৷

ওই ভিস্তিওয়ালাদের জনৈক আমাদের স্নানঘরের দু-দু’টো মস্ত ড্রামে রোজ ভরে দিত স্নানের জল—একেকদিন দুবার—কারণ প্লাম্বিং-এর দোষে সরকারি জলে কোনওমতে রান্নাঘরের জলাধার গুলো আধভরা হত৷ পেতলের গাগরি ভরে টিপকল থেকে খাবার জল আনত খ্যান্ত পিসি, পরের দিকে ষষ্ঠীর মা; পেছনের বারান্দার রেলিঙের বেদিতে সার সার মাটির কুঁজো, কলসি আর সুরাইতে জল ইভ়াপোরেশনে ঠান্ডা হয়ে থাকত দারুণ গ্রীষ্মে—দাদু বলতেন, “এলিমেন্টারি ফিজ়িক্স!” বাতিওয়ালা সন্ধের মুখেও আসতো মই কাঁধে বাতি জ্বালাতে৷ ওরিয়েন্টাল কোম্পানির গ্যাস, কর্পোরেশনের বেতনভুক বাতিওয়ালা৷…

ওই পেছনের বারান্দার ঠান্ডা সিমেন্টের রেলিঙে চিবুক রেখে দাঁড়ালে দেখা যেত হিন্দুস্তান পার্কে সুনীতি চাটুজ্যে মশাইয়ের বাড়ি (এখন, হায় ভাষাচার্য, সেখানে ফ্যাব ইন্ডিয়ার দোকান) আর সযত্নলালিত বাগান, বিস্তীর্ণ বাগান—অন্তত আমার শৈশবে সেটা বিস্তীর্ণ দেখাত৷ তারও ওপারে অখিল হাউস  নামাঙ্কিত বাড়ি৷ কবে একদিন সুনীতিবাবুর বাগান জুড়ে, দাদুর বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যাওয়া অখিল হাউস ঢেকে, গজিয়ে উঠলো একটা স্বভাবসিদ্ধ, কদর্য বহুতল৷

সুনীতিবাবুর বাড়িতে দু’একবার গেছি বাবার সঙ্গে৷ তাঁর বাগানের একান্তে কয়েকটা কলাগাছ ছিল, হয়ত নিষ্ফল বাহারি কলা৷ রাতের অন্ধকারে পেছনের বারান্দা থেকে তাদের আবছা দেখা যেত, হালকা হাওয়ায় পাতা দোলাচ্ছে; শিশুমন দিয়ে দেখলে মনে হত অনেকগুলো ডাইনি বুড়ি—ইংরেজিতে গোটা একটা কোভ়়েন—আমাকে ডাকছে, আয় আয়৷ কল্পনাবিলাসী চোখে আমি অখিল হাউসের ছাদে অনেক ছোট ছোট পরি ও পর দেখতাম৷ শৈশবটা আসলে রূপকথারই দুনিয়া: রাজপুত্তুর রাজকন্যে নিয়ে মেয়েরা ভাবে হয়ত, আমার জগতে পরি-পর, ডাক-ডাকিনী, দৈত্য-দানবরা যত্রতত্র বিচরণ করত৷ রুনকি, আমার পিসির মেয়ে, ঠিক দশ মাসের ছোট আমার চেয়ে; আমার ওপর তার অগাধ বিশ্বাস৷ তাকে বলেছিলাম সুনীতিবাগানের সেই ডাইনিতত্ত্ব, এবং পত্রপাঠ সে বিশ্বাস করেছিল; যদিও আমি নিশ্চিত জানতাম দিনের আলোয় কোভ়েন-টা আটপৌরে কলার ঝাড় হয়ে যায়৷ রুনকি সে কথা কি করে জানবে, ওরা যে গড়িয়াহাট মার্কেট পেরিয়ে, আলেয়া সিনেমা পেরিয়ে, গিনি ম্যানশনেরও ওপারে  সেই সুদূর একডালিয়ায় থাকে!

আমরা, মানে বাবা মা আমি, থাকতাম একঘোড়ার শহর শা’গঞ্জে, কলকাতা থেকে স্থলপথে চল্লিশ মাইল দূর, রেলপথে হাওড়া টু  ব্যান্ডেল চল্লিশ কি.মি. ছাপা থাকত উত্তরছাপ্পান্ন টিকিটে৷ হ্যাঁ, ১৯৫৬-তে হাওড়া-ব্যান্ডেল রেলপথের বিদ্যুতায়ন হয়, অল স্টপ এক ঘন্টা, গ্যালপিং ৪০ মিনিট৷ আগে লাগত দেড়-পৌনেদুই ঘন্টা; এখন নতুন করে আবার তাই, আমরা পিছু হটছি কিনা! লিউইস ক্যারলের বাচ্চা অ্যালিস সাচ্চা বুঝেছিল, এক জায়গায় থাকতে গেলেও প্রাণপন দৌড়োতে হয়; আমাদের জননেতারা সেটা ঠিক বোঝেননি এখনও!

ফি শনিবার আমরা সপরিবারে কলকাতায় যেতাম, ফিরতাম হয় রবিবার বেশি রাতে, নয়তো  সোমবার  খুব ভোরে৷  রাতের  ট্রেনে ফিরলে আমি উৎসুক হয়ে লজেন্সওয়ালা শম্ভুকে খুঁজতাম: হাতে মস্ত একটা তারের বলয়, তা থেকে নানা বর্ণ-গন্ধের ল্যাবেনচুষের সেলোফেন প্যাকেট ঝুলত, “প্যারি  লরেন, প্যারি লরেন, নেবেন ভাই, প্যারি লরেন, নেবু লরেন, অরেন লরেন, হজমি লরেন!” আর উঠতেন শ্বেতকেশ বলাইবাবু, নেমে যেতেন মানকুন্ডুতে; তিনি আমাকে ইসকা মন্তর ফিসকা মন্তরের জাদু শিখিয়েছিলেন জোরদার, নিমেষে জোড়া আঙুলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের অমোঘ, নজর কাড়া জাদু! কদাচিৎ ভোরের ট্রেনে ফেরার সময় এক শ্মশ্রুগুম্ফময় গেরুয়াপরা ভেকধারীকে দেখতাম; সে দোতারা বাজিয়ে মাঝে মাঝে কন্যাদায়গ্রস্তদের উদ্দেশে গাইতো “টাটা-বাটা-**** বড়, সেথায় জামাই সন্ধান কর” (নক্ষত্র চতুষ্টয়ের জায়গায় যে কোনো একটা তৎকালীন, লাগসই, বহুজাতিকের নাম কল্পনা করে নেবেন), তবে সে বাউল ছিলনা বোধহয়৷

সেই শা’গঞ্জ তখন এক ঘোড়ার শহর তো বটেই! ব্যান্ডেল স্টেশনে তখন একটা, মানে একটাই, সার্থকনামা স্টেশন ওয়াগন ছিল, সবুজ রঙের, সাতটা থেকে সাতটা, সুপ্রাচীন ফোর্ড, তার পেছনের একটা দরজা কেরোসিন কাঠের; সওয়ার ভর্তি হলে অথবা ড্রাইভার সাহেবের মর্জি হলে ছাড়ত৷ আর ছিল মজিদ মিঞার এক-ঘোড়ার ছ্যাকরা৷ সাইকেল রিকশা অবশ্যই থাকত তবে সংখ্যায় নগণ্য, বেশি রাতে তারা জুজুর ভয়ে বাড়ি যেত শুতে; মাথায় থাকুক অন্ন চিন্তা—আপনি বাঁচলে বাপের নাম! জি.টি. রোডে ক্যাম্বেল দম্পতির হত্যা কাণ্ড পাবলিক অতো দিন পরেও মনে রেখেছিল৷

তখন হাওড়া স্টেশন থেকেও অবশ্য ঘোড়ার গাড়ি নির্বাসিত হয়নি—সীমিত রাস্তায়, কাছের রাস্তায় চলত; আলাদা স্ট্যান্ড ছিল বোধহয় আজকের স্টিমারঘাটার টিকিটঘরের কাছে৷ অশ্ববরে মাখামাখি হয়ে থাকত তাদের পার্কিং লট। একবার ভারি বর্ষণে কলকাতা অর্ধনিমজ্জিত, যন্ত্রযান অকুলান, হাওড়ায় নেমে অসহায় আমরা গ্র্যান্ড হোটেল অবধি ঘোড়ার গাড়িতে গিয়েছিলাম—আবছা মনে আছে—সেখান থেকে ট্যাক্সি৷…

দুশো দুইয়ের কালো গেটের ডানদিকের পাল্লায় একপা ফাঁসিয়ে অন্য পায়ের ধাক্কায় আমরা মহানন্দে ক্যাঁচকোঁচ করে দুলতাম—দীর্ঘকালীন মজবুতির পরীক্ষায় সসম্মানে পাশ করেছিল ঢালাইয়ের কারিগর—তবে দরওয়ানজি দেখতে পেলে তেড়ে এসে বিনীত ভঙ্গিতে তুলসীদাসি সুর করে বলত, “ভেঙ্-গে গেলে/ গির পড়োগে,/ চোট লাগেগা,/ বুঢ়াবাবুকো/ নুকসান হোবে!” গেটের ডানদিকে ফুটপাথ থেকে খাড়া উঠে গেছে একটা তিনতলা বাক্সবাড়ি৷ তার রাস্তামুখী একতলায় কয়েকটা দোকান: আগে ছিল সীবনী, পাদুকালয় আর টাইমকো, তারও আগে সীবনীর জায়গায় ছিল দরওয়ানজির একটি মাত্র পা-কলের দোকান, পর্দা সেলাই, থানকাপড় বা ধুতি দিয়ে লুঙ্গি সেলাই, মায় উজ্জ্বলা ছুটকির ফ্রক (আমারও একটা কামিজ় একবার) সেলাই হত, পুজোর আগে রড থেকে ঝুলত বেশ কিছু অর্ডারি শার্ট প্যান্ট৷ এখন সেখানে সার সার শাড়ি আর রকমারি রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান—চেনা দায়!

মাস পড়লে দরওয়ানজি এসে বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেত বাড়িউলির প্রতিভূ হয়ে; পারসি বাড়িউলিকে আমি অন্তত দেখিনি কখনও৷ দুর্গাঠাকুর ভাসানের সময় দরওয়ানজি নানা দাদুকে দোকানের দুটো ভাঁজ করা কেঠো চেয়ার সসম্মানে বের করে দিত: “বাবুজি, মাজি, আরাম কোরেন, নহি তো থক জাওগে!” দাদু বলতেন ‘অতিভক্তি...!’

গেটের বাঁদিকে মদনের এক চিলতে পানবিড়ির দোকান, তবে সেখানে ভিমটো লেমনেডও পাওয়া যেত, পরের দিকে কোকাকোলা জুসলা৷ নরম করে চাইলে বেগনি লুঙ্গি, হাপহাতা গেঞ্জি আর হাতে গলায় অনেক মাদুলি তাবিজ পরা মদন মাঝেমধ্যে এক আধ চিমটে মিষ্টি মশলাও দিত—নিতান্ত অনিচ্ছায়৷ এখন সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাটার দোকান৷

চাতালের এপাশ ওপাশ দুটো একই রকম তেতলা বাড়ি, দুটোরই ঠিকানা ২০২৷ ফুটপাথের ওপর যে বাড়িটা তার দোতলায় দু নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন বুদ্ধদেব বসু—সেটাই কবিতাভবন, সেখান থেকেই কবিতা  পত্রিকা প্রকাশ হত, এবং বৈশাখী, আর এক পয়সায় একটি  সিরিজের চটি কিন্তু মূল্যবান কাব্যমালা৷ সুনীল বসুর মিলিতা  তার অন্যতম; তাঁর ঘোঁড়া   কবিতাটা চন্দ্রবিন্দুদোষে জ্যেঠার নাপসন্দ—আমার পছন্দ ছিল কেঁচো  বলে কবিতাটা: “কেঁচো চেয়েছিল মাটিকে জানতে/ খানা খন্দলে দেহলি প্রান্তে...৷”

ছবি তোলার জন্য স্বাভাবিক আলো দরকার হলে, অথবা গুরুজন পরিবৃত ফ্ল্যাটে সিগারেট খাওয়ার সুযোগ অকুলান হলে বাবা ছাদে যেতেন৷ দাদুর ফ্ল্যাটের এজমালি ছাদে একটা ভাঙা ট্রাইসাইকেল ছিল; ছিল মানে তার ভগ্নাবশেষ আরকি! কখনো ভাবিনি কার সাইকেল—দাদার না দেবুদার—হয়ত শিশুসুলভ অধিকারবোধে ভাবতাম আমারই! মনে আছে, তার বিচ্ছিন্ন দ্বিচক্র চক্রদন্ডটা দুহাতে বারবেলের মত মাথার ওপর তুলতাম অল্পায়াসে—বাবার তোলা একটা ফিকে হয়ে যাওয়া ছবি এখনো বোধহয় মায়ের ফেলে যাওয়া সযত্ন সংগ্রহের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে—স্মৃতিটা হয়ত সেই ছবিটারই শুধু৷ ওই ছাদে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির—যে দিকটায় এখন বাটার দোকান—খনাদি মনাদির সঙ্গে জমে গিয়েছিল আমার, আমারই মারফত আমাদের হাঁড়ির খবর তারা জানত—মায়ের কাছে বকুনি খেতাম তাই৷ একেকদিন খাবার নিয়ে দুষ্টুমি করলে মা  এক  হাতে থালা অন্য হাতে আমার ঘেঁটি ধরে ছাদে ঘুরে ঘুরে খাওয়াতেন৷ কোনো অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ একসময় ছাদটা আমাদের অনধিগম্য হয়ে যায়; প্রথম প্রথম মিস করতাম খুব, পরে সয়ে গেল আর পাঁচটা বঞ্চনার মত৷ ছেলেবেলার কথা লিখতে বসে দীর্ঘকাল পরে সেই ছাদের কথা মনে পড়ল, যে ছাদটাকে শৈশবের স্বল্প পরিচয়ের পর আর দেখিনি কোনোওদিন, দেখবও না!

আর মনে পড়ল, গ্রীষ্মের দুপুর বেলা যখন ঠাকুদ্দা ঠাকুমার শয়নকক্ষের সব কাঠের জানলা বন্ধ, খড়খড়ির সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তীব্র সূর্যালোক লখিন্দরের বাসরের ছিদ্রান্বেষী সাপটার মত অলক্ষিতে ঘরে ঢুকে পড়ত, তার মধ্যে আপন মনে নাচত লক্ষ ধুলিকণা৷ একেকদিন নিদ্রাহীন আমি দেখতে পেতাম সাদা পরদার ওপর রঙিন শাড়ির উলটো ছবি, রঙিন এবং সীমিত চৌহদ্দিতে চলিষ্ণু, খনাদি মনাদিদের বাড়ির মতির মা বেলায় কাচা কাপড় মেলছে: পিন হোল ক্যামেরার দ্য ভ়িনসীয় যাদু! দীর্ঘ, দীর্ঘতর নিশ্বাসের মত নির্জন আর বিধুর স্মৃতি সব, ফিকে হয়ে যাওয়া ফ়োটোগ্রাফের মত—জানিনা তার কতটা বাস্তব আর কতটা মায়া!

তবে, ওই বাড়ির কোনার ঘর, যেটা আগে ছিল বাবা মায়ের শয়নকক্ষ, মধ্যযুগে খাবার ঘর, সবশেষে দাদা বৌদির বাসর, সেটাই আমার জন্মস্থান; আমার চিকিৎসক দাদু নিজের হাতে আমায় আলো দেখিয়েছেন ৷


© Aniruddha Sen - Member WaaS

কাক

- উদয়ন দাসগুপ্ত -


কাক আমার খুব পছন্দ !

হয়ত আপনার ভুরু উপরে উঠছে – “ওই আরেকজন ‘গ্রে সাবজেক্ট’ শুরু করল | আপদ, কাক নাকি পছন্দের !”

কী করি, আমার ভালো লাগে | দেখতে কালো, ডাকও নাকি কালো - বিপদের অগ্রদূত | কিন্তু খুব মজার পাখি |

কাক খেলেছেন কখনও ?

যদি কোনও কাক রাস্তায় বসে, তার সাথে হাঁটাহাঁটি খেলুন, সে উড়বে না, হাঁটবে চক্কর দিয়ে দিয়ে | আপনাকে খেপাবে, রেগে গেলে ডাকবে, ক্লান্ত হলে ডানা ছড়াবে, কিন্তু উড়বে না – যদি আপনার খেলার মেজাজ খেলোয়াড়ি থাকে | তাই বলে, খুব কাছে যাবেন না, তাহলে “খেলব না” ভাব করে পালিয়ে যাবে |

এই খেলাটা সকালে এবং বিকালে ভালো হয়, কারণ কাকের পেট ভরা থাকে | কেবল পেটে বড় দুঃখ, এমন কি কাকেরও | যদি একাধিক কাক থাকে, একজন খেলে, বাকিরা দ্যাখে, নাক গলায় না বাঙালিদের মত | এবার আপনার চরিত্র বিশ্লেষণ করুন | মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ফাটাফাটি | মুখ (বা ঠোঁট) দেখলে বুঝবেন সে হাসছে, না রাগছে, না বিরক্ত হচ্ছে | পাগল ভাবছেন, ভাবুন | আমি কাক খেলি, আর খেলবো !

আগে বলি |

লুকোচুরি খেলা | কোনও একা কাক যদি গাছের ডালে বা জানালায় বসে থাকে, আর সে যদি আপনার চোখ দেখতে না পায়, ভীষণ খেপে যায়, আর আগুপিছু হয়ে চেষ্টা করে আপনার চোখ দেখতে | দেখাবেন, তবেই মজা পাবেন, নইলে ‘মাটিং চকার’, মানে খেলা মাটি | আর যদি দেখেন, যা মজা পাবেন, তা কোনও বাংলা সিরিয়াল এ পাবেন না | বিশ্বাস হচ্ছে না ? বয়ে গেল | আমি চোর পুলিশ খেলব বিনা পয়সার পালা | কেউ দেখে ফেললে আপনার সম্মানে আগুন, কিন্তু এটা তো কাক পক্ষীর জানার কথা নয় | কাকের সংঘবদ্ধতা সবাই জানে, এই খেলায় প্রমাণ পাবেন |

কাকের ভাষা বোঝেন ? খুব সোজা | সবটা বলব না | আমি ‘কাক সহজপাঠ’ লিখতে বসিনি | শুধু অন্য চোখে বা অন্য মনে ভাবতে বলেছি | “যদি ভালো না লাগে তো খেল না কাক !”

কাক শুনেছি যমের বাহন | তাকে খেতে দিলে নাকি যম খুশি হয় | মানে,

“কাকের মুখের দিলাম অন্ন,
যমের দুয়ার হল কণ্টকাকীর্ণ” |

তাই বলে ভাত দেবেন না | আস্কারা দিলে কাকও মানুষের মত পেয়ে বসবে, আর আপনাকে বিরক্ত করবে | কিন্তু, তাতে মনে হয় না আপনার আয়ু বাড়বে, বরঞ্চ মাঝখান থেকে চালের খরচা বেড়ে যাবে | যা দিনকাল, পোষাতে পারবেন না, আর পোষ মানাতেও | তার চেয়ে বিনে পয়সায়, নিশ্চুপে খেলুন | এটা প্রারম্ভিক খেলা | উদ্যোক্তা আসবে না হয়তো | তবে কাক নিজে সম্প্রচার করে, আর সেটা এত ফলপ্রসূ যে মুহূর্তে একশ কাক জড়ো হয়ে যাবে | যদি বেগড়বাই করেন তাহলে অবশ্য,  

“একতাবদ্ধ হয়ে আমরা জুড়ি,
একতা-হীন হয়ে আমরা উড়ি !”

ফিরে আসি যমের দুয়ারে, থুড়ি, বাহনের কথায় | কাক যদি যমের সাথীই হয়, তবে ভয় কেন পায় ছোট পাখিদের ? পায়রা কে ডরায়, কিন্তু চিলের পিছনে লাগে | চরিত্র বিশ্লেষণ করুন, উত্তর নিজেই পাবেন | আমি কোন কাকতাড়ুয়া এসেছি, যে বলব ?

“হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হোলো” ... ইত্যাদি – সন্ধেবেলা, কাকেদের সভা দেখেছেন ? একশ কাক তারে বসে চুপচাপ দিনের বিশ্লেষণ করে | (এটা বানিয়ে বললাম, জানি না কী করে | যদি খবর পাই, বলব ) যাক, সে অন্য কথা | গোধূলি তো আমরা দেখি না, তবে এই সময়টাকে “কাক-লগ্ন’ বলতে আমার আপত্তি নেই |

কাকের প্রেম দেখেছেন ? পার্কে উঁকিঝুঁকি না মেরে, সোজাসুজি বাড়ির জানালা দিয়ে দেখুন | কাক পায়রার মত লোক দেখানো প্রেম করে না, গভীর প্রেম, কথা অবান্তর সেখানে | দোসর কে কত সুরে ডাকে – হ্রস্ব সুর, দীর্ঘ সুর, নিচু সুর, উঁচু সুর, কখনও আলাদা সুরে, কখনো পুনরাবৃত্তি করে |

দেখুন আর ভাবুন, আগামী জন্মে কাক হয়ে আমার সাথে প্রাণের আলাপন করবেন কি না |

পুনর্জন্ম আছে কি না জিজ্ঞাসা করছেন ? আরেক দিন বলব | সব এক দিনে হয় নাকি ?

“যা, যা, হুস !”


© Udayan Dasgupta - Member WaaS

দুটি কবিতা

- অনিরুদ্ধ ফাল্গুনি সেন -


(1) Rabindranath Tagore

The original, as it appears in Gītavitāna,
Pauṣa 1380 Vangābda edition, Kārtika 1412 V reprint

পেয়েছি ছুটি, বিদায় দেহো ভাই—
সবারে আমি প্রণাম করে যাই৷৷
ফিরায়ে দিনু ঘরের চাবি, রাখি না আর ঘরের দাবি—
সবার আমি প্রসাদবাণী চাই৷৷
অনেক দিন ছিলাম প্রতিবেশী,
দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশি৷
প্রভাত হয়ে এসেছে রাতি, নিবিয়া গেল কোণের বাতি—
পড়েছে ডাক, চলেছি আমি তাই৷৷


The inept translation


I’ve earned my leave, pray, let me go —
I bid adieu to all;
I return the keys, I’m done with them —
Pray, bless me one and all!
Good neighbours we were, I borrowed more
Than I was able to give;
It’s nearly dawn, the lamp’s gone out —
My turn has come, must leave!
 

October 27, 2013
------------------------------------------------------

(2) A well-known doggerel

The original


বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এলো বান,
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো, তিন কন্যে দান।
এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন, এক কন্যে খান,
আরেক কন্যে গোসা করে বাপের বাড়ি যান।


The translation


Pitter patter raindrops, the river is in spate,
Shiva weds three lasses on that very date.
One cooks well, the other eats, and the third is very cross…
Off she goes to mama’s house wading through the slosh


June 19, 2014



© Aniruddha Sen - Member WaaS

বেলা শেষে

- তাপস কুমার দত্ত -



অনেক কথা বলতে চেয়েছিলাম,
বলা হয়নি
কিছু বার্তা দিতে চেয়েছিলাম,
তোমরা বুঝেছ কি বোঝনি
আমি বুঝিনি ।

ভেবেছিলাম মনে রাখার মত কিছু কাজ করব, পারিনি
এমন কোন মাঠে প্রবেশাধিকার পাইনি
যেখানে বিস্তীর্ণ সবুজাঞ্চলে আমার মনের মতন
ফসল ফলাতে পারি,
গাছের গা ছুঁয়ে বলতে পারি ভালো থেকো
পাতা ছুঁয়ে বলতে পারি ভালো থেকো ।

দাঁত চেপে কিছু সুখ-দুঃখের
আর অনেক পাওয়া না পাওয়ার ফলক ছুঁয়ে
ঠিক এমনভাবে জীবন কাটিয়ে ফেলার
কোন মানে হয় !
চারদিক ঝলমল
আড়ালে হাহাকার
তবু ভেঙে পড়া নয়
দেখি না শেষ তক কি হয় !

আমার অবসরের বিনোদন
এখন আমার মত করে -
অনেক অসফল স্বপ্নের ভিড় ঠেলে
নতুন স্বপ্ন নিয়ে খেলা করা ।

এখন মুখোশ খোলা মানুষের ভাঙাচোরা মুখ
সন্তর্পণে দূরে ঠেলে
বিচরণ নতুন পথে
সঙ্গে অনেক নতুন সহচর,
মনে হয় বেলা শেষে 
ধীরে ধীরে ভরে যাচ্ছে চাঁদ আর তারার আলোয়
আমার ঘর, আমার চরাচর ৷



© Tapas K Datta - Member WaaS

স্বাধীনতা

- মানস কুমার ঘোষ -


খাবারগুলো গুছিয়ে, খাবারের নির্দেশগুলো বুঝিয়ে,
বেলা এগারটা বেজে গেলো, জয়ার বেরোতে বেরোতে ;
বাপের বাড়িতে আজ গেট-টুগেদার,
আমার যাওয়া হল না – পড়েছি যে জ্বরে ;
তবে আজ দেদার স্বাধীনতা -
মনের মত খাবার না পেলেও, সময় মেনে খাওয়ার হুকুমনামা নেই,
ইচ্ছেমত টিভি দেখা যাবে ; সন্ধ্যা অবধি আজ আমি একেবারে একা ।
সামনের বারান্দাতে এসে বসি ।
পার্কটায় বাচ্চা ছেলেগুলোর পায়ে ফুটবল ;
আর একটু দূরে কতকগুলো বস্তির ছেলে মেয়ে কী যেন খেলছে –
লুকোচুরি, এক্কা-দোক্কা, নাকি অন্যকিছু ।
অনেকটা দূরে হঠাৎ চোখ পড়ে গেল –
চুপটি করে একলা বসে আছে সে,
ছেঁড়া হাতকাটা গেঞ্জি, আর কালো রঙের হাফ প্যান্ট ।
নামটা কী যেন –
বীল্লা, ঝিলকু, রঘু, বাবলা নাকি রাজা ; ভুলে গেছি একেবারে ।
ছেলেবেলা থেকেই মা বেপাত্তা, বাপটাও টেঁসেছে গত বছর –
মদ খেয়ে, লিভারটা পচিয়ে ।
বড়ো রাস্তার মুখেই এ পাড়ার বাজার, সেখানেই শিবুর চায়ের দোকান,
দোকানে কাজ করতো ছেলেটা,
চা-বানানো, বাসন-মাজা, আরও অনেক ফাঁই–ফরমাস ।
খেতে পেত সেখানেই ।
খাবারের সাথে চড়, গাঁট্টাও জুটত রীতিমত ।
চোখ দুটো বেশ মায়াবী, তার সাথে আছে বুদ্ধির ছোঁয়া ।
লেখাপড়া হয়ত হত, যদি সুযোগ পেত ।
শুনে শুনে দু চারটে ইংরাজি বলে ফেলত মাঝে মাঝে ।
দোকানের হিসাবটাও শিখছিল চটপট করে ।
এ পাড়ার কিছু সমাজসেবীদের চোখে পড়ে গেল,
মিটিং হয়ে গেল – চাইল্ড লেবার, প্রলেতারিয়েতের হাহাকার –
কিছুই বাদ গেল না ।
মিছিল হল, ওসির কাছে গেল আন্দোলনের হুঙ্কার ।
শিবুর দোকানটা ভেঙ্গে দিল পুলিশ – এইতো তিন দিন আগে ।
শিবু অবশ্য আর একটু দূরে খুলে ফেলল নতুন চায়ের ঝাঁপি ।
এসে গেল নতুন দুটো ছেলে ।
এবারের দোকানটা থানার কোল ঘেঁষে - সমাজসেবীদের চোখ পড়ার কথা নয় ।
শুধু থানাতে চা দিতে হবে ডিসকাউন্টে ।
ছেলেটাকে আর শিবুর দোকানে বেগার খাটতে হবে না ।
আন্দোলনের জয়ে উল্লসিত সমাজসেবীদের দল - হয়ে গেল বিজয় মিছিল ।

দুদিন ধরে সামনের পার্কে বসে আছে ছেলেটা – পেটে খিদে নিয়ে ।
আর নেই কোন চড় ও গাঁট্টা
এখন শুধু অবাধ স্বাধীনতা ।

16 Sept 2012


© Manas K Ghosh - Member WaaS

আবার আসিব ফিরে

- সর্বাণীদাস রায় -


আবার আসিব ফিরে ষাট-ঊর্ধ্ব শিশুদের ভিড়ে – এই পাতাটায় ,
হয়ত সর্বাণী নয়, আলোক চ্যাটার্জীর বহু বর্ণ ফুল আর পাখির ছবি দেখে ।
হয়ত প্রদীপের অনবদ্য মদ্য আর লোভনীয় ভোজ্য চেখে চেখে ;
হয়ত বা ছবি দেব -- যৌবনের – গুম্ফ রহিবে ওষ্ঠ পরে ,
সারাদিন কেটে যাবে বন্ধুদের কৌতুকময় মন্তব্য পড়ে পড়ে ;
আবার আসিব আমি ষাট-ঊর্ধ্ব প্রবীণ শিশুদের ভালোবেসে ,
আনন্দের আতিশয্যে ভুলে যাব সব চিন্তা দুঃখ হেসে হেসে ;
সুদীপ রায়ের গড়া আমাদের সকলের প্রিয় পাতাটায় ।

হয়ত দেখিব চেয়ে নতুন নতুন মজা তৈরি হয়েছে পাতা জোড়া ,
শঙ্কর মুখার্জীর রসালো ইংরেজি চুটকিলা কৌতুক আর ছড়া ।
হয়ত নানুর লেখা ব্রুকলিন শহরের অজ্ঞাত কত কথা ,
নরেশ মিন্ত্রি তার রেইকি দিয়ে সারাচ্ছে শরীর মনের যত ব্যথা ;
দিন যায় -- ষাট-ঊর্ধ্ব তরুণের দল ঝাঁকে ঝাঁকে আসিতেছে সুদীপের নীড়ে ,
দেখিবে আমারে ফের – ঠিকঠাক আসিয়াছি দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরে ।     

(জীবনানন্দ দাসের কবিতার ভাব-অবলম্বনে)


© Sarbanidas Roy - Non-member WaaS

স্বাধীনতার সুয়াদ

- অরূপ গোস্বামী -


(পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া-পুরুলিয়া জেলায় প্রচলিত কথ্য ভাষায় রচিত)

কিলাব সিকরেটরী বুধন মাষ্টর বলল্য আস্যে ঘরে
স্বাধীনতার দিনে আসতে হবেক ধুতি পাঞ্জাবী পরে ।
সকাল সকাল যাঁয়ে কিলাবে তুলবি তিরঙা ঝান্ডা
তুকেই খুঁড়া মালা পরাবেক হামদের লীডার পান্ডা ।
শুনেই গরবে ফুল্যে উঠে হামার ছেঁদাফাটা পাঞ্জরা
ইয়াদে আসে জওয়ানির সেদিন যেমন আগুন ঝরা ।

রাধু মাষ্টর বলল্য মিটিনে বিলাতি জিনিস জ্বালাও
স্বাধীন করে দেশটো মুদের লালমুঁহা যত পালাও ।
গাঁয়ের যত বাউরি-বাগদী সঙ্গে মাহাত সাঁওতাল
জড় করলি একসাথে সব ইবার লালমুঁহারা সামাল ।
ছাঁচায় ছাঁচায় ঘুরলি সবাই বিলাতি জিনিস মাঙতে
মিলল বহুত সিলিকের শাড়ী আগুন লাগালি রাত্যে ।
সকাল হতেই গরা পল্টন ঢুকল্য গাঁয়ে ভিড়ভিড়াই
ইজ্জত লুটে গাঁয়ের বিটির গুলি চালায় গিড়গিড়ায় ।
কাঁড়বাঁশ আর টাঙি লিয়ে বাউরি-বাগদী-সাঁওতাল
জবর লড়াই করল্য সবাই গরা পল্টনরা বেসামাল ।
মরল্য ক’জন গাঁয়ের ছেল্যা, ভরল্য জেলে মুদের
রাখল্য ছ’মাস জেল হাজতে ছ্যাঁকা গরম শিকের ।
আঁকল শরীলে কালদাগ আর জবান কাট্যে গঙা
দেশটো ইপর স্বাধীন হল্য চারদিকে উড়ে তিরঙা ।
আজাদীর সুয়াদ নাই পালি শুধু গঙা হয়েই রইলি
কেউ কনদিন লেয় না খবর বাঁচলি নকি মরলি ।

বুধন তবুও পরধান হয়ে হামকে ইজ্জত দিতে চায়
পরলি ধবধব্যা ধুতি পাঞ্জাবী লাতনিটো সঙে যায় ।
কিলাবে তখন চলছে মাইকে “টুনির মা”য়ের গান
লাচাকুঁদায় মশগুল উঁরা, কে দিবেক মুকে সম্মান ।
চারদিকে দেখি মদের বতল, ঝিমাছ্যে ক’টা ছঁড়া
বুধন আসেই বলল্য হামকে “কেমন আছগো খুঁড়া” ?
মাটির ভাঁড়ে চা আনাল্য লাতনির লেড়্যা বিস্কুট
ভটভটি করে আসল্য পান্ডা মুখে তখনও চুরুট ।
বুধন আস্যে বলল্য হামকে ইবার উড়াও ঝান্ডা
রশিতে বাঁধা তিরঙা পতাকা লম্বা বাঁশের ডান্ডা ।
ফরফরায়ে উড়ল্য তিরঙা রশির এক হ্যাঁচকায়
শরীলের কাল দাগগুল্যা সব যেমন গেল মিলায় ।
আজকে পরথম মনে হল্য দাগগুল্যা মুর গরবের
স্বাধীনতার সুয়াদ বড় মিঠা দিনটা শুধু পরবের ।
গেঁদা ফুলের পরাল্য মালা, হাততালি দেয় লকে
গঙা বলে বক্তিমা ছাড়, জল আস্যে যায় চখ্যে ।

ফাঁকা হতেই বসল্য বুধন হামার পাশের চিয়ারে
সিগরেটে টান মারে বলে শুনে লাও খুঁড়া ইবারে
ইজ্জত দিলি মালা পরালি জিন্দেগীতে নাই পাও
ক্যালেনপাড়ের জমিন টুকু কিলাবকে লিখে দাও ।
নাইলে হামার ছেল্যাগুল্যা দেখেছ্য কেমন বজ্জাত
লাতনি তুমার ডাগরডুগর ছিঁড়ে খাবেক ইজ্জত ।
মনে হল নালীর পকারা কাল দাগে কিলবিলাই
দেশের লাগ্যে লড়াই করার পালি সম্মান ইটাই !
হ্যাঁচকা টানে তুললি হাতে তিরঙা জড়ানো বাঁশ
বুধন কিছু বুঝার আগেই উঁকে বনাই দিলি লাশ  ।


কিছু আঞ্চলিক শব্দের অর্থ:-
কিলাব (ক্লাব); সিকরেটরী (সেক্রেটারী); 
ছাঁচায় (ঘরের সামনের চালা);
গরা (সাদা চামড়ার মানুষ);
পল্টন (সৈন্য);
ভিড়ভিড়াই (দলে দলে);
বিটির (কন্যার);
কাঁড়বাঁশ (তীর-ধনুক);
পরধান (প্রধান);
ভটভটি (মোটর সাইকেল);
পরথম (প্রথম)


© Arup Kumar Goswami

ক্ষত

- সুদীপ রায় -


১.
কাটাকুটি দিন গুলো যতই পায়রা ওড়াক,
আমি জানি ক্ষতটা কোথায় ।
ইশারায় যে ঘর গড়েছ তুমি,
সে বিষের খোঁজ রেখেছ কি ?
এখন যতই দেখাও তুমি নির্মোহ দিনের প্রলোভন,
ঠা ঠা রোদ্দুরে দরজা বন্ধ সব ।
টুপিটা উঠিয়ে মুখ ঢেকে রেখে
পা ডুবিয়ে বোসো ... মাঝ রাতে বাজার খুললে,
বেজন্মা লোকের ভিড় তো হবেই ।
ধন্বন্তরি এক খুঁজে নিতে হবে ...
মনে রেখো ... ছায়াবীজ আছে আসেপাশে ।
আলো ফোটাটাই শুধু বাকি ।

২.
এই নাও ...
আধখানা ঘুম এ হাতে দিলাম তোমায়
ভাঙ্গা খড়খড়ি খুলে ... আর কী বা আছে !
এ দিয়ে রোদ্দুর এসে ঘরে ঢুকে যাবে অনায়াসে,
ছেঁড়া কাপড়ের ছায়া থির থির কাঁপবে মাটিতে ।
হাওয়ায় কাঁপবে চুল । গর্ভিণী গাভীর মতো
জাবর কাটবে তুমি তাম্বুল মুখে ।
তোমার কী ভয় ? বিষাক্ত জলেতে
মোমবাতি ভাসিয়েছ তুমি ।
ফালা ফালা মনটা আমার ফ্রিজেতে ভরা আছে ।
গ্রীষ্মের দুপুর এলে হাতে ধরে দেব ... বলো দেখি,
ক্ষত ঢাকা দিতে এক খান ঘোর কথা পাই ?
বেলা পড়ে এলো ।


© Sudip Roy - Member WaaS

মন যমুনা

- সুদীপ রায় -


জলের কুহকে জল জল গায়ে মেখে
একদিন ঠিক উবে যাবে
ডুবে যাওয়া ঘূর্ণি ঝড়ের ছোঁয়া
প্রসব যন্ত্রণা আনে ...
মায়াবী পাখিরা আসে
ফের উড়ে চলে যায়,
দিন বাড়ে, চুলেতে কলপ ।
মন যমুনায় নাও ভেসে যায়
ছপ ছপ ... ছপ ছপ ছপ
ডুবো ডুবো মন নিয়ে ঝাউবন চুপ ।
বুক ধড়পড় ...
চোখের পাতায় আরেকটা চোখ,
লোলুপ অধর ।
সাগর সঙ্গমে নিজের নিয়মে
ঠিক এসে যাবে,
কবর খোঁড়ার শাবলটা
রেখেছি কোথাও !
থির থির থির ... ভেসে চলে
ভেসে যাবে ... চলে যাবে
মন যমুনায় নাও ।


© Sudip Roy - Member WaaS

এ কী আনন্দ

- সুদীপ রায় -


এ কী আনন্দে আজ ভরিল ভুবন,
দশ দিশা আলোকিত, মন আজ পুলকিত,
হৃদয় সে চমকিত, হাসে অনুখন ।
এ কী আনন্দে আজ ভরিল ভুবন ।

নির্মল আকাশে দেখি রূপের বাহার ।
প্রাণে জাগে স্পন্দন, হৃদয়ের বন্ধন,
দৃষ্টি সে নন্দন, বর্ণন তাহার ।
নির্মল আকাশে দেখি রূপের বাহার ।

শীতল সমীর বহে, সুখের আবেশ,
সদা সে আনন্দধারা, মন মনে মন্হারা
চারিদিকে পড়ে সাড়া, নব উন্মেষ ।
শীতল সমীর বহে, সুখের আবেশ ।

হৃদয় পাখিরে তুই, পাখা মেলে ধর ।
উড়িব আকাশে তোর সাথে তারপর ।


© Sudip Roy - Member WaaS

নদী

- সুদীপ রায় -


স্বতন্ত্র সহজবোধ্য অন্য কিছু চাই ...
নদীর পথের মতো সর্পিল নয়,
সহজ, সরল কিছু ।
নদীকেই না হয় চেয়ে নেব একবার ।
আগাগোড়া নদীটিই চাই,
নদীর জলটি চাই না মোটেই ।
যদি সহজিয়া অন্য কিছু দিতে পারো,
একদম জটিল চোখের বাইরে অন্য কোনো কিছু ...
তাই দিতে পারো ।
পায়রার খোপের মধ্যে পড়ে থাকা
জাদুদন্ডটি দাও না খানিক ।
তুলে নেব জাদুদন্ডখানি ।
পায়রার খোপ উড়ে চলে যাবে ।
চোখের আঠায় আটকাবে দৈনিক যাপন ।
আহা ... সহজবোধ্য অন্য কিছু যদি থেকে থাকে,
উপনদী, শাখানদী কোনো, তাই বুক পেতে নেব ।
জল টুকু শুষে নেবে একালের দধিচিরা ।


© Sudip Roy - Member WaaS

তিলোত্তমার সমভিব্যাহার

- ইন্দ্রনীর -


রেল-‘টিশানের টিকিট-বাবুর ভীষণ খারাপ মতিগতি,
বলে, “লাইন ছেড়ে দাঁড়া, বৌরা যাদের আছে পতি”
ইচ্ছে হল দিই জবাবে, যুতসই এক মুখঝামটা টাটা
আমার বেলায় বলে কিনা, “সরা মুখের ঘোমটা-টা !”

(... তা, যাক ...)
আব্রু খসালে, ভুরু কুঁচকে, মুখখানি মোর খুঁটিয়ে চেয়ে
বললে, “যাবি কতদূর লো, অচিন গাঁয়ের চিকণ মেয়ে ?”
প্রশ্ন করি, “হেথায় কি ‘কোত্থাও’ যাওয়ার টিকিট আছে ?”
বাবু বললে, “আগে বল তুই, দূরে যাবি, না ধারে-কাছে”
আমি বললেম, “ইচ্ছে আছে যেতে কোনও অচিনপুর”
বাবু বলে, “সেথা যেতে পারিস, গড়িয়ে যাবে সারা দুপুর
তারপরেতে ফিরতে চাইলে দেখবি নেইকো গাড়ি আর
অচিনপুরেই করতে হবে বাকি দিন আর রাতটা কাবার”
আমি শুধাই, “তা, নয় হোলো, তাতে তোমার দায় কী ?
ফিরতি-টিকিট দিলেও দিও, দাম আধা তার রেখে বাকি
ফিরে আসবই, নাগর সাথে, বাকি পয়সা চুকিয়ে দিতে”
বাবু হাসে, “তার চেয়ে তুই, আমায় নিয়ে যা বিকাতে”

এই ভাবেতে, ছল-কথাতে, ছল-হাসিতে হয় বড্ড দেরী
তবুও বাবুর মন মানে না, গলার আওয়াজ শোনায় ভারী
বলে, “তুই হক কথা শোন, বলছি যেমন, তেমনটি কর
ইস্টিশানের পেলাটফর্মে, দেখবি আছে এক অপেক্ষাঘর
দূর পাল্লার ট্রেনের পালা, দ্যাখ বসে তার জানলা দিয়ে
চোখে দেখে, নে না বালাই, দূর দূরান্তের আশ মিটিয়ে !”

(ভাবি)
‘যে সব জায়গার নাম শুনে চক্ষু হয় মোর ডাগর ডাগর
ঐ রায়রংগড়, রূপনারাণপুর, স্বপনপুরী, কি চাঁদনীনগর ...
নাগর আমার ভুগছে নেশায়, নিরুদ্দেশের, সর্বনেশে
কী দরকারে ছুটব আমি, তার খোঁজে অজ ভিনদেশে ?’

যেতে গিয়ে, খোলা মাথায় সিঁথির ‘পরে আঁচল তুলে,
শুনি পিছন থেকে আমায় ডেকে টিকিট-বাবু বলে,
“দেখে রাখলি, ফিরে আসিস, আমার এই টিকিটঘর
যেথাই যাবি টিকিট পাবি, ইস্টিশানও সব কী জব্বর !”
...
“এখন যা তুই, বেলা হল, মা বেড়েছে ভাতের পাত
ভাত-ঘুমেতে দিন কাটিয়ে ফিরব আমি সাঁঝ কি রাত”

(ভাবি)
‘টিকিট-বাবুর বুঝি জুটেছে, কালিদাসের বৌ, বরাতে
নইলে কি কেউ টিকিট বেচে ইষ্টিশানে পড়ে রাতে ?’

(তখনই)
টিকিট ঘরের জানলা বন্ধ করতে তার দু’ হাত বাড়িয়ে
বলে টিকিট-বাবু, আমার তিল-চিবুকে হঠ নজর দিয়ে,
“আগে কেন দেখিনি তোর, সুন্দর ওই আঁচিল ? ও মা,
কী সুন্দরী. কী রূপসী তুই, তিল-আঁচিলের তিলোত্তমা !
হুম ...
লাগবে না তোর টিকিট, তুই যা ফিরে তোর বাড়িতে
সাঁঝ-বেলা তোকে উঠিয়ে দেব, উজ্জয়িনীর গাড়িতে”

...
রেল-‘টিশানের টিকিট-বাবু, কালিদাস, এক ফেরেববাজ
মিছেই, কথায় লুটেছে মোর তিল-আঁচিলের সখের লাজ   ||



© Indroneer - Member WaaS

অশ্বান্ড কান্ড


জীবন যুদ্ধে পরাস্ত, সংসার রোগে আক্রান্ত বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে যে কতিপয় কথা ঘন ঘন শোনা যায়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাহাতে প্রথম ইষ্টদেবতার নাম, দ্বিতীয় ‘ধুর ছাই’ ও তৃতীয় হইল ‘ঘোড়ার ডিম’ ।

শৈশব হইতে শুনিতে অভ্যস্ত, কোনও দিন ইহার গভীরে যাই নাই যে ‘ঘোড়ার ডিম’ প্রকৃত কী বস্তু । আমাদের যুগে ছিল কৌতুক বেশী কৌতূহল কম, কিন্তু বর্তমান যুগের ধারা যে বিপরীত । আমার সংযমহীন কথাবার্তার ফল হইল এই যে একদিন শ্রীমতী আসিয়া কহিলেন, “তোমার সেয়ানা ছোট-ছেলে ঘোড়ার ডিম খেতে চায়” । বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করিয়া পাল্টা প্রশ্ন করিলাম, “হাফ-বয়েল না মামলেট না ঝোল?” তিনি কহিলেন, “ইয়ার্কি ছাড়, ছেলেকে সামলাও তুমি” । আমি প্রসঙ্গ বদল করিতে প্রয়াস করিলাম, “আচ্ছা আমি ওকে বলে দেব ঘোড়ার ডাক্তার হতে । বিনে পয়সায় যত চায় ঘোড়ার ডিম – পাবে আর প্রাণ ভরে খাবে” । স্ত্রী হুঙ্কার সহ বিদ্রূপ করিলেন, “তুমি পারলে না ফোঁড়ার ডাক্তার হতে, আর ছেলে হবে কিনা ঘোড়ার ডাক্তার !” এই খোঁটার কারণ বহুকাল যাবত তিনি ‘বাতের ওপর বিষ ফোঁড়া’ হইতে ভুগিতেছেন । কোনও প্রলেপ কাজ করেনা । আমার প্রেমের উষ্ণ-আর্দ্র প্রলাপেও তাহার কোনও উপশম হয় নাই । ইদানীং আফিমের আশ্রয় লইয়াছেন ।

অগত্যা ঘোড়ার ডিম সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করা সমীচীন বোধ করিলাম । কিন্তু দেখা গেল যে বিষয়টি প্রশ্ন-সার –

                              কি করে যে লোকে চেনে, কী অশ্বডিম্ব ?
                               ছাপার জগতে যার নেই কোনও বিম্ব
                             বিজ্ঞাপন খুঁজে খুঁজে হলাম যে হিমসিম,
                           কোথায় কী ভাবে পাব আস্ত ঘোড়ার ডিম ?

                              গোল নাকি লম্বা, নাকি সেটা চৌকস ?
                          কততে ডজন দেয়, ক’ টাকায় ওয়ান বক্স ?
                               হাতে গুনে বিক্রি, নাকি দাঁড়িপাল্লায় ?
                          ঝুড়ি ভরে আনে, নাকি রাখে ডিম গামলায় ?
                          কখনই বা বেচে, কোন দিন, ক্ষণ, বেলাতে ?
                            দিনের বাজারে, নাকি নিশুতি বে-রাতে ?

“ঠিক হ্যায়, কোই বাত নেহি” এই ভাবে হিন্দিতে নিজেকে আশ্বস্ত করিয়া বাজারে রওয়ানা হইলাম ।
কিন্তু সে সফর বৃথায় গেল । কেহ কহিল কলিকাতায় যান - বাঘের চর্বি, শুয়ারের দাঁত, সাপের চামড়া সবই পাইবেন । কেহ কহিল আস্তাবলে খোঁজ লইতে । শেষে প্রশ্নটি ডিম্ব-জড়িত বুঝিয়া ভেক-ছত্র বিক্রেতা উপদেশ দিল ডিমওয়ালী কে জিজ্ঞাসা করিতে । ডিমওয়ালী সামনে ডিম পাড়িয়া বসিয়া আছে, এবং তাহার পিছনে বাঁধা এক মুরগী ক্ষুব্ধ-স্বরে জানাইতেছে যে ডিমগুলি আসলে তাহার কৃত ফল । সে (মহিলা, মুরগী নহে) দুঃখিত স্বরে কহিল, “বাবা মুরগীর দানা যোগাতে পারিনা, ঘোড়ার খোরাক কোথা থেকে যোগাবো ?”

ফিরিলাম ভাবিতে ভাবিতে –

                             কে কেনে, কে ব্যাচে, কে দ্যায় সাপ্লাই ?
                               এই সব প্রশ্নের কোথা পাই রিপ্লাই ?

ফিরিবার পথে পাড়ার মুখে দর্পণ বাবুর সহিত মোলাকাত । তিনি যথারীতি নখ খুঁটিতে খুঁটিতে হাসিলেন, এবং শুধাইলেন, “কি খবর? বাজার থেকে, ব্যাজার মুখে, হাতে থলি, খালি খালি । বলি ব্যাপারটা কী ?”

ভদ্রলোকের পরিচয় -

                                বাবুর নাম দর্পণ, নখের বড় শৌখিন
                                বড় বড় নখ তাঁর, নানান রঙে রঙ্গিন
                              জীবন উৎসর্গিত তাঁর অজ্ঞানতা বর্জনে
                             দুনিয়ার সব জ্ঞান রাখেন তিনি নখদর্পণে

তাঁহার এক এক রঙের নখে এক এক বিষয়ের জ্ঞান । সাদা – অর্থ ও ধন-সম্পদ; হলুদ – রন্ধনপ্রণালী ও কুশলতা; সবুজ – গ্রাম্য জীবন ও কৃষি পদ্ধতি ; গোলাপি – প্রেম ও বিরহ ; লাল – বিবাহ, প্রজনন ও সংসার পালন ; নীল – ভৌতিক, রাসায়নিক ইত্যাদি বিজ্ঞান ; মেটে - জীব বিজ্ঞান ; কালো – মৃত্যু, নরক ও পরকাল, ইত্যাদি, ইত্যাদি । ইদানীং তাঁহার পায়ের নখেও ও রং ধরিতে শুরু হইয়াছে, যেমন যেমন জ্ঞান জগতে বিস্তার হইতেছে তেমন তেমন তিনি নিজেকে প্রস্তুত করিতেছেন ।

বিপদে দর্পণ বাবুর শরণাপন্ন হয়নাই এমন ব্যক্তি বিরল – অন্তত আমাদের পাড়ায় । তাহাকে সংক্ষেপে আমার সমস্যা অবগত করাইলাম । তিনি আমার কথা শোনেন আর বিস্মিত মুখে মেটে রঙের নখ খুঁটিতে খুঁটিয়ে মাথা নাড়েন – কিন্তু মুখে রা নাই । তাঁহার মৌনতায় সন্দেহ জাগে:

                                 প্রশ্ন কি ডিম্বের, নাকি তাহা অশ্বের ?
                               পরিধি স্থানীয় কি, নাকি তাহা বিশ্বের ?
                                কী সব জানিলে তবে হবে নিষ্পত্তি
                                  অশ্বডিম্ব পিছে লুকান যে সত্যি

শেষে দর্পণ বাবু বিব্রত মুখে কহিলেন, “বিষয়টা ভাবিয়ে তুলেছে । একটু গবেষণা করা দরকার । কোনভাবে দুটো দিন ম্যানেজ করে এসে দেখা করুন ।”

আমার কনিষ্ঠ সন্তান চেহারায় বড় সড় হইলেও দুগ্ধ পানে আসক্ত । তাহার দুগ্ধে সামান্য আফিম দিয়া তাহার মা তাহাকে সামলাইল । ঘোড়ার ডিম লইয়া তাহার যে প্রবল আবেগ তাহা দু’দিন শান্ত থাকিল ।

তৃতীয় দিন সকালেই দর্পণ বাবুর বাটিকায় পদার্পণ করিলাম । তিনি হাস্য মুখে সম্বর্ধনা করিলেন । চা পান অন্তে আমাকে পার্শ্ববর্তী তাঁহার অধ্যয়ন কক্ষে লইয়া গেলেন । এক কেদারায় বসাইয়া কহিলেন, “একটা কথা বোঝা গেল যে ঘোড়া ডিম পাড়ে না, বা বলা যায়, ডিম পাড়ার উপযুক্ত নয় ।”

আমার বিস্মিত বিমর্ষ মুখ দেখিয়া তিনি আমাকে আশ্বস্ত করিতে চাহিলেন । “এই রকম ভাবার স্বপক্ষে আমার যুক্তি গুলো একে একে দেখুন”, এই কথা কহিয়া সামনে রাখা এক ত্রিপদের ঘোমটা উন্মোচন করিলেন । দেখিলাম তাহাতে বড় বড় সাদা কাগজে তাঁহার হস্তাক্ষরে কী সব কথা লেখা । প্রথম পাতায় লেখা :

প্রধান কথা ডিম পাড়া প্রাণী যেমন মুরগী, হাঁস, ইত্যাদির কিছু জৈবিক বিশিষ্টতা আছে যা ঘোড়ার নেই ।

অতঃপর তিনি একে একে দেখাইলেন, পাতার পর পাতায় লেখা:

এক

হাঁস, মুরগীর আছে উঁচানো পেখম, ডিম পাড়তে যাতে ব্যাঘাত না হয় । ঘোড়ার লেজ ঠিক উল্টো, ডিমের রাস্তার মুখ ঢেকে ঝোলে । ঘোড়া যদি ডিম পাড়ে তবে তার লেজে ডিম আটকাবে । সে অবস্থায় ঘোড়া কী করবে ? ঘোড়া কি লেজে-ডিমে হয়ে ছটফট করবেনা ?

দুই

এটা তো জানা কথা যে ঘোড়া বসে না, দাঁড়িয়ে জীবন কাটায় । তাহলে সে মাটিতে ডিম পাড়বে কী করে ? দাঁড়িয়ে ডিম পাড়লে তো অত ওপর থেকে পড়ে ফটাস করে সব শেষ হবে ।

তিন

ডিমে তা দিতে ঘোড়াকে তো মাটিতে বসতে হবে । সদা দণ্ডায়মান ঘোড়ার পক্ষে সেটা কী করে সম্ভব ?

চার

গরম কালে ডিমের গরম লাগলে হাঁস, মুরগী পেখম দিয়ে ডিম কে হাওয়া করে ঠাণ্ডা করে । ঘোড়া লেজ দিয়ে ডিম সামলাবে কী করে ? তা-খাওয়া ঘোড়ার ডিম তো হাফ-বয়েল হয়ে যাবে ।

পাঁচ

ডিম ভেঙ্গে বেরুতে চঞ্চু লাগে । বাচ্চা ঘোড়া তা পাবে কোথায় ? সে তো স্রেফ দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে ।


এই প্রদর্শন শেষ হইলে তিনি কহিলেন, “অর্থাৎ, ভেবে দেখুন, ঘোড়া কি ডিম দিতে উপযুক্ত ? না । একদম ই নয় ।

“এত গেল যুক্তি । এবার তথ্যে আসা যাক । আমি আশে পাশের সব আস্তাবলে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কেউ কোথাও ডিম্ব-জাত ঘোড়ার বাচ্চা দেখেনি । উপরন্তু সবাই বললে ঘোড়া যা ছটফটে, তার নালের লাথে আস্তাবলে কোনও ডিম আদৌ আস্ত থাকবে না । সবারই এক কথা – ঘোড়া মাত্রই জঠর-প্রসূত । হাঁ, তবে এ কথা জানা গিয়েছে পাড়ার ভেট্রীনারি ডাক্তার থেকে যে কিছু জন্তু জঠরে-ডিম্ব-প্রসূত হয় – যাকে বলে ওভোভিভিপ্যারস – কিন্তু সেটা মাছদের মাঝে হয় – যেমন হাঙ্গর মাছ । তা, ডাক্তার বললেন ঘোড়া মাছ গোত্রের প্রাণী নয় ।

“শেষমেশ, ভেবে দেখুন ঘোড়া শুধু কেন, গাধা, খচ্চর কেউই ডিম পাড়ে না । যেমন নেই গাধার ডিম, যেমন নেই খচ্চরের ডিম, তেমনি হয়না ঘোড়ার ডিম ।”

                                 যুক্তি তো অকাট্য, তথ্য ও যে সত্যি
                                বুক থেকে নড়ে যায় বিশ্বাসের ভিত্তি
                               কিন্তু থেকেই যায় মূল আমার সমস্যা
                               ছেলেকে কী বোঝাব ? পাই না ভরসা ।

আমার মনের কথা অনুমান করিয়া দর্পণ বাবু কহিলেন, “আপনি এক কাজ করুন । কিছুদিন বাজার থেকে এমনি কোনও ডিম কিনে ঘোড়ার ডিম বলে ছেলেকে খাওয়ান । ততদিনে আমি সমস্যার একটা হল বের করছি ।”

কিন্তু ছেলে আমার ততই সেয়ানা । ডিম দেখিয়াই সে সন্দেহ প্রকাশ করিল, “বাবা, অত বড় ঘোড়ার এতটুকু ডিম ? ডিমওয়ালী তোমাকে ঠকিয়েছে ।”

দ্বিতীয় দফায় ডিমওয়ালী কে অনুরোধ করিলাম, বড় মুরগীর ডিম দিতে । সে তো হাসিয়াই মরিল । কহিল, “বড় মুরগীর ডিম, না মুরগীর বড় ডিম ? মুরগী বড় হলেও ডিম তো একই মাপের দেয় ।” সে যাত্রা হাঁসের ডিম লইয়া ফিরিলাম । কিন্তু, কিঞ্চিত বড় সে ডিমও অধমের কাজে লাগিল না , খোকার পছন্দ হইল না তাহার সাইজ ।

অন্যদিকে দর্পণ বাবু উপদেশ দিতে কার্পণ্য করেন না । প্রত্যহ তিনি খবর নেন সন্তান সন্তুষ্টি সম্বন্ধে । মাঝে মাঝে এমত আভাস দেন যে তাঁহার গবেষণা অব্যাহত আছে ।

একদিন তিনি প্রচুর উত্তেজিত । আমাকে দেখিয়া জোর করমর্দন সহ কহিলেন, “পেয়েছি এক মহা ডিমের সন্ধান । অস্ট্রিচের ডিম, সব থেকে বড় ডিম । সেটা নির্ঘাত ঘোড়ার ডিম বলে চালানো যাবে, আপনার খোকা ধরতে পারবে না ।”

আমার জ্ঞানগম্যি কম । এই দুর্বোধ্য নাম শুনি নাই কখনো । সে কথায় দর্পণ বাবু যারপরনাই বিস্মিত হইলেন, “সে কী ? পক্ষীর রাজা অস্ট্রিচ । আপনি তার নাম শোনেন নি ?”

আমি কহিলাম, “আমি তো এক পক্ষীরাজ জানি, যে হয় উড়ন্ত ঘোড়া, যদিও এটা জানি না ঘোড়া ওড়ে কিনা, এবং কী করে ।”
দর্পণ বাবুর আমার কথা লুফিয়া লইয়া কহিলেন, “সেটাও দেখে নেব আমার গবেষণার মাঝে ।”

কিছুদিন পর দর্পণ বাবু ডাকিয়া পাঠাইলেন । ভয়ঙ্কর উত্তেজিত তিনি । উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে কহিলেন, “পেয়েছি, পেয়েছি । সব রহস্য পরিষ্কার এবার । “ তারপর আমাকে বসাইয়া দ্রুতপদে পায়চারী করিতে লাগিলেন । মনে হইল যেন তিনি চিন্তাধারা কে পঙক্তি-বদ্ধ করিতে ব্যস্ত । কিছুক্ষণ বাদে কহিলেন, “মনে আছে আপনি সেদিন পক্ষীরাজের কথা বললেন ? “

আমি কহিলাম, “আছে ।”

তিনি আমার পিঠ চাপড়াইয়া কহিলেন, “ধারণা করতে পারেন কি ওই এক কথায় আমি এক মস্ত ক্লু পেলাম । সেদিন থেকে মাথায় ঘুরতে লাগলো একসাথে তিন রহস্য । এক - ঘোড়ার সাথে ডিমের কী সম্পর্ক হতে পারে, যদি ঘোড়া ডিমই দিতে অক্ষম ? দুই – পক্ষীরাজের ওড়ার রাজ কী ? আর তিন – এই দুই রহস্যের মাঝে কোনও যোগাযোগ আছে কিনা ?

“এই সব ভাবছি তখন আমার চাকর নিয়ে এলো সকালের জলখাবার, আর বলল, “বাবু, আপনার ডিমটা রেখে যাব কি ঢেকে ?” “আমার ডিম না মুরগীর ডিম, আহাম্মুক ?” জিজ্ঞাসা করব চাকরটাকে, কি অমনি প্রথম রহস্য জলবৎ তরল ! বুঝেছেন ? অশ্বডিম্ব তস্য ডিম্ব নয়, তস্য ভোজ্য !! অর্থাৎ ‘ঘোড়ার ডিম’ মানে ... যে ডিম ঘোড়া খায় ! সে সম্ভাবনা আমি যে একবারও ভেবে দেখিনি, মাথায়ই আসেনি ।
“তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন জাগল মনে, ঘোড়া যদি ডিম খায় তাহলে তার কী হবে ? পেটে সইবে কি ? নাকি তার প্রভাবে ঘোড়ার মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া হতে পারে ? ভাবুন দেখি মাথা খাটিয়ে ।”

আমি হতাশ ভাবে মাথা নাড়িলাম । এ মাথা নড়ে মাত্র, খাটে না । খাটে শয়ন করিলে সে টুকুও নড়েও না ।

উত্তেজিত দর্পণ বাবু কহিলেন, সফলতার উল্লাসে, “অবিলম্বে আমি করলাম থট-এক্সপেরিমেন্ট – অর্থাৎ চিন্তন-প্রয়োগ । অমনি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেলাম পরিণতি – ঘোড়া ডিম খেলে ঘোড়ার ডানা গজাবে পাখির মতো – আর ঘোড়া উড়বে, উড়ে বেড়াবে । ঘোড়া, ঘোড়া থেকে পক্ষীরাজ হয়ে যাবে ।
“হ্যাঁ ... অতএব, একেবারে সাবধান । ছেলেকে ঘোড়ার কেন, কোনও ডিমই খাওয়ানো চলবে না । এ ব্যাপারে অসতর্ক হলে, ছেলেকে ডিম খাওয়ালে, নিশ্চিত জানুন যে ছেলেরও ডানা গজাবে ।”

ভগ্নহৃদয়ে বাড়ি ফিরিলাম ।

গৃহিণী সব কথা শুনিয়া কহিলেন, “তাহলে বাপু কাজ নেই । তুমি ঘোড়ার ডিম খোঁজা বন্ধ কর ।”
আমি শুধাইলাম, “ছেলে কি মানবে ?”
গিন্নি কহিলেন, “সে চিন্তা আমার । দুধ দিচ্ছি আফিম দিয়ে, ছেলে দিব্বি খাচ্ছে । খেয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমাচ্ছে । কী জানি, মুখে তো কিছু বলেনা, হয়ত স্বপ্নেই ঘোড়ার ডিম খাচ্ছে ।”
...


সারাংশ:-

                                ছোট এক খামারেতে ছিল শিশু ঘোড়া
                               ছুটতে তো জানতো সে, জানত না ওড়া
                                 সবুজ ঘাসের শেষে, দেখে নীলাকাশ
                                 লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তার মিটত না আশ
                                 হাওয়ায় পাখির দল উড়ে যেতে দেখে
                                 ভাবত কী করে ওরা উড়তে বা শেখে

                                  ক্রমে শিশু ঘোড়া হল এতই হতাশ
                                  কেঁদে কেটে একসা, যায় যায় শ্বাস
                                    চাষা গিয়ে ভড়কে, ডাকে ডাক্তার
                                   ডাক্তার এসে, দেখে, দ্যায় মত তার
                                শিশু ঘোড়া দুর্বল, না খেতে পেয়ে ঘাস
                                 দেহ খানা জিরজিরে, হাড়ে নেই মাস
                                 ঘোড়ার হয়েছে জেদ, উড়তে সে চায়
                                 শিশুকে বাঁচাতে হলে করো কিছু ব্যয়
                                  দুধ খাওয়াও তাকে মিশিয়ে আফিম
                                  সেই সাথে দাও জোড়া মুরগীর ডিম
                                  ডিম খেয়ে জোর হবে, ছুটবে আবার
                                 আফিমের নেশায় হবে বাকি কারবার
                                ভাববে সে, “ছুটছি না, উড়ছি আকাশে
                                   মাটির উপরে নই, ভাসছি বাতাসে”

                                   ওষুধে তো কাজ হল, বাঁচল ঘোড়া
                                   কিন্তু চাষার ছিল কপালটাই পোড়া
                                   ডিম খেয়ে খেয়ে দুটো ডানা গজাল
                                  অন্তে সে পক্ষীরাজ হয়ে উড়ে পালাল
---


তাই বলি –

                                যদি, প্রিয় পুত্র খেতে চায় ঘোড়ার-ডিম
                                দেবে কি দেবেনা ভেবে হইও না মলিন
                                 কপটে আনিয়ে, দিও অস্ট্রিচের আণ্ডা
                                 যতই খাক না ডিম, উড্ডয়নের ফান্ডা
                               বাগে পাবে না ছেলে, এ চালাকির প্যাঁচে
                                ছেলে হবে বুদ্ধি-মন্দ, ঠিক বাপের ধাঁচে




© Indroneer - Member WaaS

এবার পূজোয়

- উজ্জ্বল সেনগুপ্ত -


পূজোর দিনের স্মৃতি যত, কেউ কখনো ভোলে ?
পেঁজা তুলো মেঘ ভেসে যায় নীল আকাশের কোলে –
শরৎ এলো, শরৎ এলো,
রোদে ভুবন ঝলোমলো –
পূজোয় আবার লুটবো মজা সবাই দলে দলে !

বছর ঘুরে দুগ্‌গা এলো, লক্ষ্মী, সরস্বতী –
সাথে এলো কার্ত্তিক আর এলো গণপতি ;
শিব ঠাকুর বাঘের ছালে –
অসুর মায়ের পায়ের তলে,
জানি, মায়ের দুই চরণেই অন্তিম তার গতি !

নতুন জামা কাপড়েতে চল রে সবাই –
এ থান থেকে ও থানেতে বেড়িয়ে বেড়াই ।
ঠাকুর দেখে হেথায় হোথায়,
কেউ বা কোঁকায় পায়ের ব্যথায় –
তবুও তো আনন্দেরই পাই না সীমা ভাই !

দশমীতে বাজছে যে ঐ বিসর্জনের ঘণ্টা,
ঘনিয়ে আসে তারই সাথে শেষ বিদায়ের ক্ষণটা –
ভাসান হবে নদীর কোলে –
গাল ভেসে যায় চোখের জলে –
আসছে বছর আবার হবে, চাইছে সবার মনটা !!